যেতে পারেন টাঙ্গুয়ার হাওর

টাঙ্গুয়ার হাওর সুনামগঞ্জ জেলার প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি। জলাবন, নীল আকাশ, পাহাড় ও চোখ জুড়ানো সবুজ এই হাওরকে অপরুপ সাজে সাজিয়েছে। বর্ষাকালে এই হাওরের আয়তন প্রায় ২০,০০০ একর পর্যন্ত হয়ে থাকে। শীতকালে এই হাওরে প্রায় ২৫০ প্রজাতির অতিথি পাখির বিচরণ ঘটে।

টাঙ্গুয়ার হাওড় থেকে ভারতের মেঘালয়ের পাহারগুলো দেখা যায়। মেঘালয় থেকে প্রায় ৩০টি ছোট বড় ঝর্ণা বা ছড়া টাঙ্গুয়ার হাওরে এসে মিশেছে। এই হাওরে একটি ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে, এর আশেপাশের পানি খুবই স্বচ্ছ হওয়ায় উপর থেকে হাওরের তলা দেখা যায়। টাঙ্গুয়ার হাওরে ছোট বড় প্রায় ৪৬ টি দ্বীপের মত ভাসমান গ্রাম বা দ্বীপ গ্রাম আছে।

টাঙ্গুয়ার হাওর কখন যাবেন

বর্ষাকাল টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। বছরের অন্য সময় সাধারণত এর পানি অনেক কম থাকে। তবে পাখি দেখতে চাইলে শীতকালেই যেতে হবে আপনাকে। টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণের সাথে আরো যা দেখতে পারেন ছোট-ছোট সোয়াম্প ফরেস্ট, নিলাদ্রি লেক, বারিক টিলা, যাদুকাটা নদী, লাউড়ের গড়, অপরূপ সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত।

টাঙ্গুয়ার হাওর কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ : প্রতিদিন ঢাকার সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে মামুন ও শ্যামলী পরিবহণের বাস সরাসরি সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় এবং মহাখালী থেকে ছেড়ে যায় এনা পরিবহণের বাস। এসব বাসে নন-এসিতে জনপ্রতি টিকেট কাটতে ৫৫০ টাকা লাগে আর সুনামগঞ্জ পৌঁছাতে প্রায় ছয় ঘন্টা সময় লাগে।

সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ : সিলেটের কুমারগাঁও বাস স্ট্যান্ড থেকে সুনামগঞ্জ যাবার লোকাল ও সিটিং বাস আছে। সিটিং বাস ভাড়া ১০০ টাকা, সুনামগঞ্জ যেতে দুই ঘন্টার মত সময় লাগবে। অথবা শাহজালাল মাজারের সামনে থেকে সুনামগঞ্জ যাবার লাইট গাড়ি তে ২০০ টাকা ভাড়ায় যাওয়া যায়।

সুনামগঞ্জ থেকে টাংগুয়া : সুনামগঞ্জ নেমে সুরমা নদীর উপর নির্মিত বড় ব্রীজের কাছে লেগুনা/সিএনজি/বাইক করে তাহিরপুরে সহজেই যাওয়া যায়। তাহিরপুরে নৌকা ঘাট থেকে সাইজ এবং সামর্থ অনুযায়ী নৌকা ভাড়া করে বেড়িয়ে আসুন টাঙ্গুয়ার হাওর থেকে। তবে শীতকালে পানি কমে যায় বলে আপনাকে লেগুনা/সিএনজি/বাইক যোগে যেতে হবে সোলেমানপুর। সেখান থেকে নৌকা ভাড়া করে নিতে পারবেন। আর শীতকালে গেলে আপনি অতিথি পাখির দেখা পাবেন।

কোথায় থাকবেন

টাঙ্গুয়ার হাওরে থাকার জন্য তেমন কোন ব্যবস্থা নেই। তবে যদি নৌকায় রাত কাটাতে চান তবে নিরাপত্তার জন্যে পাড়ের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করুন। আর ঘর ভাড়া করতে চাইলে টেকেরঘাট এলাকায় হাওর বিলাশ নামে কাঠের বাড়িতে সল্প মূল্যে রুম ভাড়া নিয়ে থাকতে পারবেন। তবে টাঙ্গুয়ার হাওরে নৌকায় এক রাত থাকার অভিজ্ঞতা নিলে অবশ্যই ভাল লাগবে।

নৌকা ভাড়া

নৌকা ভাড়া করতে কিছু বিষয়ের উপর লক্ষ্য রাখুন যেমন নৌকায় বাথরুম আছে কিনা, সোলার প্যানেলের মাধ্যমে মোবাইল চার্জ দেওয়া, লাইট ও ফ্যানের ব্যবস্থা ব্যবস্থা আছে কিনা। নৌকা ভাড়া করতে দরদাম করে নিন। নৌকা ভাড়া মূলত ৩টি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। নৌকায় ধারণ ক্ষমতা, নৌকার সুযোগ সুবিধা এবং সিজনের উপর। সাধারণত ছোট নৌকা ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা, মাঝারি নৌকা ২৫০০ থেকে ৩৫০০ টাকা এবং বড় নৌকা ৩৫০০ থেকে ৬০০০ টাকায় সারাদিনের জন্য ভাড়া করা যায়। ১ রাত নৌকায় কাটাতে চাইলে ছোট নৌকা ৩৫০০-৫০০০ টাকা এবং বড় নৌকা ভাড়া করতে ৭০০০ থেকে ১০,০০০ টাকার মত লাগবে। নৌকায় সোলার প্যানেল ও লাইফ জ্যাকেটের ব্যবস্থা না থাকলে তাহিরপুর বাজার থেকে আইপিএস ও লাইফ জ্যাকেট ভাড়া নিতে পারবেন। রান্নার জন্য নৌকার মাঝিকে খরচের টাকা দিলে সে বাবুর্চি নিয়ে যাবে কিংবা নিজেই রান্নার ব্যবস্থা করে ফেলবে। কি করবেন তা অবশ্যই মাঝির সাথে আগে আলোচনা করে দরদাম ঠিক করে নিবেন।

খাবার ব্যবস্থা

দিনে দিনে ঘুরে চলে আসলে তাহিরপুরে খাবার হোটেল থেকে রওনা হবার আগে সকালের ও ফিরে আসার পর দুপুরের খাবার হাওরের প্রায় ২০ থেকে ২৫ প্রজাতির মাছের মধ্যে নিজের পছন্দের মাছ দিয়ে আহার পর্ব সেরে ফেলতে পারেন। আর যদি টাঙ্গুয়ায় রাতে থাকার পরিকল্পনা থাকে এবং নিজেরা রান্না করে খাওয়ার ইচ্ছে থাকে তবে তাহিরপুর থেকে নৌকায় উঠার আগে যে কয়দিন অবস্থান করবেন সেই কয়দিনের বাজার করে নিতে পারেন। আর তাজা মাছ কেনার জন্য হাওরের মাঝখানের ছোট বাজারগুলোতে যেতে পারেন। এছাড়া সাথে নিতে পারেন দেশি হাঁস কিংবা দারুণ সব শুঁটকি। আবার নিজেরা রান্না করার ঝামেলা এড়াতে চাইলে টেকেরঘাট রাত্রি যাপন করলে সেখানে টেকেরঘাট বাজার থেকে রাতের খাবার খেয়ে নিতে পারবেন।

টাঙ্গুয়ার হাওরে ২ দিন ১ রাতের ট্যুর প্ল্যান

সুবিধামত যেকোন দিন রাতের বাসে করে সুনামগঞ্জ গেলে সকাল ৭ টার মধ্যে সেখানে পৌছে যাবেন। সুনামগঞ্জে নাস্তা সেরে সিএনজি ভাড়া করে তাহিরপুর যেতে ১ ঘন্টার মত সময় লাগবে। ঘাট থেকে নৌকা ঠিক করে নৌকায় ওঠার আগে ২ দিন ১ রাতের জন্য মাছ ছাড়া অন্য প্রয়োজনীয় বাজার করে নিন। সকাল ৯ থেকে ১০ টার মধ্যে নৌকায় যাত্রা শুরু করার চেষ্টা করুন। সোজা নৌকা নিয়ে চলে আসুন ওয়াচ টাওয়ার এলাকায়।

এদিকে জলাবনের সৌন্দর্য্যের পাশাপাশি ছোট ছোট নৌকা নিয়ে ছোট বাচ্চাদের ঘুরতে দেখবেন। চাইলে ওয়াচ টাওয়ারে রান্নার কাজ করে ফেলতে পারেন। ওয়াচ টাওয়ার দেখা শেষে চলে যেতে পারেন হাওরের মাঝখানে। দিগন্তজোড়া জলরাশি দেখে দুপুরের পর পরই টেকেরঘাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করুন। এই দিকে নৌকা যতই এগুতে থাকবে ততই পানি স্বচ্ছ হতে হতে এক সময় হাওরের তলা পর্যন্ত দেখতে পারবেন।

হাওরে গোসল না করে থাকলে টেকেরঘাটের নীলাদ্রি লেকে এসে গা ভেজাতে পারেন। আর এখানেই হাওরে নৌকা বেধে নৌকার মধ্যে রাত কাটিয়ে দিতে পারেন। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে যাদুকাটা নদী ও বারিক্কাটিলা দেখতে রওনা দিন। টেকেরঘাট থেকে মটরসাইকেল নিয়ে যেতে পারবেন। নৌকা নিয়ে যাওয়া যায় তবে একটু দূর হওয়ায় মাঝি আপত্তি করতে পারে অথবা আরো ২০০০ থেকে ৪০০০ টাকা অতিরিক্ত চাইতে পারে তাই সবচেয়ে ভালো হয় তাহিরপুর ঘাট থেকে নৌকা ভাড়া করার সময় মাঝিকে যাদুকাটা নিয়ে যাবার কথা বলে নৌকা ঠিক করা।

যাদুকাটা নদী ও বারিক্কাটিলা দেখে দুপুরের মধ্যে টেকেরঘাট ফিরে আরেকটু সময় হাওর ঘুরে সন্ধ্যার আগেই তাহিরপুর চলে আসুন। সেখান থেকে সিএনজি ভাড়া করে অথবা লোকাল লেগুনাতে সরাসরি সুনামগঞ্জ চলে আসতে পারেন।

ভ্রমণ খরচ

এক নজরে ১০ জনের একটি দলের ২ দিন ১ রাতের খরচের একটু ধারণা নেয়া যাক। ঢাকা থেকে আসা যাওয়ার বাস ভাড়া জনপ্রতি ১২০০ টাকা। ২ দিন ১ রাতের জন্য নৌকা ভাড়া ৬০০০ থেকে ১১,০০০ টাকা। দুই দিন নাস্তার জন্য জনপ্রতি ১০০ টাকা। প্রতিবেলা ২০০ টাকা ধরে দুইদিনের জনপ্রতি ৪ মিল খাবার খরচ ৮০০ টাকা। তাহিরপুর যাওয়া ও আসার জনপ্রতি খরচ ২৫০ টাকা। তাহিরপুর থেকে বাস স্টান্ডে আসার জনপ্রতি খরচ ২০ টাকা। অন্যান্য খরচ জনপ্রতি ৩০০ টাকা।

টাংগুয়া ভ্রমণে কিছু পরামর্শ

  • হাওর ভ্রমণকালে অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট সঙ্গে নিন।
  • হাওরে রওনা হবার আগে তাহিরপুরে থানায় আপনার নিরাপত্তার জন্যে জিডি করে নিন।
  • যে কোন কিছুর জন্যে দামাদামি করে নিবেন।
  • একসাথে গ্রুপ করে গেলে খরচ কম হবে। ৪-৫ জন বা ৮-১০ জনের গ্রুপ হলে ভালো।
  • হাওরে বজ্রপাত হলে নৌকার ছৈয়ের নিচে অবস্থান করুন।
  • খাবারের অতিরিক্ত অংশ/উচ্ছিষ্ট, প্যাকেট ইত্যাদি হাওরের পানিতে ফেলা থেকে বিরত থাকুন।
  • উচ্চ শব্দ সৃষ্টিকারী মাইক বা যন্ত্র পরিহার করুন।
  • রাতের বেলা অতিরিক্ত উজ্জ্বল আলো উৎপন্ন করবেন না।
  • টাংগুয়ার মাছ, বন্যপ্রাণী কিংবা পাখি ধরা বা এদের জীবন হুমকির মধ্যে পড়ে এমন কাজ থেকে বিরিত থাকুন।
  • টাংগুয়ার জলাবনের কোন রুপ ক্ষতিসাধন না করার ব্যপারে সতর্ক থাকুন।

ভ্রমণে সঙ্গে নিন

টর্চ ব্যাকআপ ব্যাটারিসহ, পাওয়ার ব্যাংক, ক্যাম্পিং মগ, চাদর, রেইনকোর্ট বা ছাতা, নিয়মতি সেবনীয় ওষুধ, টয়লেট পেপার, ব্যাগ ঢেকে ফেলার মতো বড় পলিথিন, প্লাস্টিকের স্যান্ডেল (চামড়ার স্যান্ডেল পরিহার করা ভাল হবে), সানগ্লাস, ক্যাপ বা হ্যাট, গামছা, খাবার পানি, হাফ প্যান্ট এবং সহজে শুকায় এমন জামাকাপড়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here