রাত কাটানো যাবে সেন্টমার্টিনে

রাত কাটানো যাবে সেন্টমার্টিনে

সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটকদের রাত্রিযাপন করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে সরকার। চলতি বছর অক্টোবর মাস থেকে সেখানে এ নিয়ম চালুর কথা ছিল। দ্বীপটির পরিবেশ রক্ষায় গত বছর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেন্টমার্টিন-টেকনাফ রুটে চলাচলকারী যাত্রীবাহী জাহাজগুলোর মালিক, পর্যটক, দ্বীপের হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক ও বাসিন্দাদের চাপে এ সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারেনি সরকার।

বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব জানান, ‘আমরা ২০১৯ সাল থেকে সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের রাত্রিযাপন নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু নানা কারণে সেই সিদ্ধান্ত

চলতি বছর থেকেই কার্যকর করতে পারছি না। তবে সেন্টমার্টিনকে রক্ষা করতে হলে সেখানে পর্যটকদের যাতায়াত সীমিত করতেই হবে। আমরাও সে লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছি। নানা কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ দ্বীপটি থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সব অধিবাসীকে মূল ভ‚খণ্ডে সরিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তার আগেই সেখানে পর্যটকদের যাতায়াত সীমিত করা হবে। সেখানে যেতে হলে রেজিস্ট্রেশন করে যেতে হবে।’

সেন্টমার্টিন হোটেল-মোটেল মালিক সমিতি মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, হঠাৎ করে পর্যটক বন্ধ করা হলে স্থানীয়দের ক্ষতি হবে। এটি না করে কী কী কারণে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে তা চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানের উপায় খুঁজতে হবে। সেখানে রাত্রিযাপন করতে না দিলে পর্যটকরা উৎসাহ হারাবে বলেও জানিয়েছে তারা।

গত বছর ২৩ সেপ্টেম্বর বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদের সভাপতিত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় ২০১৯ সালের ১ অক্টোবর থেকে দ্বীপটিতে পর্যটকদের রাত্রিযাপন করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। একই সভায় দ্বীপের বিরল জীববৈচিত্র্য রক্ষায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে তার কার্যালয়ে আরেকটি সভা হয়। সেখানে পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে তা চূড়ান্ত করতে ১৭ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কমিটি এরই মধ্যে কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। এতে ২০২৫ সালের মধ্যে সেন্টমার্টিনের স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তির মালিকানা সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনার পাশাপাশি বাসিন্দাদের অন্যত্র পুনর্বাসন করতে বলা হয়েছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসন এ দায়িত্ব পালন করবে। এছাড়া দ্বীপের বাসিন্দাদের পুনর্বাসন না করা পর্যন্ত সরকারি সহায়তা এবং চলতি বছর থেকেই পর্যটকদের দ্বীপে রাত্রিযাপন করতে না দেওয়ার সুপারিশ করে কমিটি। কমিটি মেয়াদি পরিকল্পনা চূড়ান্ত করলেও তা নিয়ে মন্ত্রণালয় আর বৈঠক করতে পারেনি। ওই বৈঠকেই চূড়ান্ত হবে কবে থেকে বাস্তবায়ন শুরু হবে মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা। এছাড়া ওই আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় ছেঁড়াদিয়ায় প্রবেশ নিষিদ্ধ ছাড়াও এক বছরের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য ৯ দফা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বাকি সিদ্ধান্তগুলো হলো- সেন্টমার্টিনে নতুন করে কোনো রাস্তা নির্মাণ করা যাবে না; নাফ নদী, দ্বীপে যাওয়া-আসার পথে এবং মূলদ্বীপে কোনো প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা যাবে না; দ্বীপের সৈকতে মোটরসাইকেল চালানো যাবে না; দ্বীপে রাতে কোনো আলো জ্বালানো যাবে না; আগামী তিন বছরের মধ্যে দৈনিক পর্যটকের সংখ্যা ৫০০ জনে নামিয়ে আনা ও দুটির বেশি জাহাজ চলাচল করতে না দেওয়া; দ্বীপে জেনারেটর ব্যবহার করা যাবে না, শুধু সৌরশক্তি ব্যবহার করতে হবে; ভ্রমণের জন্য ফি আরোপ হবে ও অনলাইনে আবেদন করে পর্যটকদের দ্বীপে যেতে হবে।

বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শীতকালে দ্বীপটিতে প্রতিদিন ৫-৭ হাজার পর্যটক ভ্রমণ করেন। তাদের অনেকেই সেখানে রাত্রিযাপন করেন। তারা দ্বীপে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ব্যাগ, ক্যান, কনটেইনারের মতো কঠিন বর্জ্য ব্যবহার করেন। পর্যটকদের জন্য পরিচালিত হোটেল-মোটেলগুলোও বর্জ্য ছড়ায়। এসব হোটেল-মোটেলের জেনারেটরের শব্দে কাছিম, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর বিশ্রামে সমস্যা ও বংশবিস্তার ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

গত তিন দশকে দ্বীপের কেয়াগাছ ও ঝোপঝাড় ধ্বংস করে ৬৬টি কটেজ, ১৯টি একতলা, ১৬টি দোতলা, ৫টি তিনতলা এবং একটি চারতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। স্থাপনার জন্য নির্মাণসামগ্রী উপজেলা প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই অসাধু ব্যবসায়ীরা দ্বীপে নিয়ে যাচ্ছেন এবং চড়া দামে বিক্রি করছেন। হোটেল-মোটেল-রেস্টুরেন্টগুলোর কোনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই এবং একমাত্র হাসপাতালের বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। দ্বীপের ভূগর্ভস্থ পানিতে মারাত্মক কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। দেশের মূল ভূখণ্ডের চেয়ে সেখানকার পানিতে ব্যাকটেরিয়া রয়েছে ১০ গুণ বেশি।

এছাড়া পাম্প ব্যবহারের কারণে দ্বীপে পানির স্তর দ্রুত নিচে নামছে এবং ছোট্ট ম্যানগ্রোভ বনও ধ্বংস হচ্ছে। সামুদ্রিক শৈবালে সমৃদ্ধ দ্বীপটিতে এ পর্যন্ত ১৫১ প্রজাতির শৈবাল শনাক্ত করা হয়েছে। সেখানকার বেশিরভাগ সামুদ্রিক প্রাণী খাদ্য ও প্রজননের জন্য শৈবালের ওপর নির্ভরশীল। দ্বীপটিতে ৪০ প্রজাতির কাঁকড়া ও দ্বীপসংলগ্ন সাগরে ২৩৪ প্রজাতির মাছ রয়েছে। ১৯৯৫ সালে সরকার সেন্টমার্টিনকে সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here